![]() |
২৬ নভেম্বার ২০২৫, ২১:৪২ মিঃ
খাদ্য অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় চলে তুঘলকি কারবার। ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটলেই বেরিয়ে আসে পুকুর চুরির ঘটনা। দুর্নীতিবাজদের লাগাম টানতে ব্যর্থ উর্ধ্বতনরা। টাকার খেলা চলে সর্বত্র। লাগামহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটে বিভিন্ন খাদ্য গুদামে। পিছিয়ে নেই নেত্রকোণাও। গোপনীয়তার পরেও দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে দুর্নীতির খবর বাইরে ছড়ায়। উর্ধ্বতনরা শুরুতে নড়েচড়ে বসলেও পরে রহস্যজনক কারণে চুপসে যান। এটাই খাদ্য অধিদপ্তরের স্টাইল। নেত্রকোণা সদর খাদ্য গুদামে দুই বছরে ৪০ কোটি টাকার বোরো ও আমন চাল নয়ছয় করার অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী সমর্থক দুর্নীতিবাজ ওসিএলএসডি আবদুল কাইয়ুম অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে কাইয়ুমের বদলি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ মিল মালিকরা চলতি আমন সংগ্রহ মৌসুমে সদর এলএসডিতে চাল সরবরাহের চুক্তি করবেন না বলে কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত আবেদন দিয়েছেন।
জানা যায়, আবদুল কাইয়ুম কারাগারে আটক সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি খাদ্য অধিদপ্তরে আলোচিত সেভেন স্টার গ্রুপের অন্যতম সদস্য। এই গ্রুপের তদবির ছাড়া কোনো কাজ করতেন না সাবেক খাদ্যমন্ত্রী। এদের জ্বালায় অতিষ্ঠ ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের উর্ধ্বতনরা। সাধন মজুমদারের আসকারা পেয়ে অতিমাত্রায় অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে আলোচিত হন খাদ্য পরিদর্শক আবদুল কাইয়ুম। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও এখনো তিনি সক্রিয়। অবশেষে ৭৯৯ টন ৯৭০ কেজি চাল নয়ছয় করতে গিয়ে ফেঁসে যান ‘ধুরন্ধর’ ওসিএলএসডি। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুল আলম ৩০-১০-২০২৫ তারিখে ১৩.০১.০০০০.০০০.০০০.১৯.০০০৪.২২.৭৯১ স্মারকে কাইয়ুমকে অন্যত্র বদলি করেন। দীর্ঘ ২৭ দিন কেটে গেলেও বুধবার (২৬-১১-২০২৫) পর্যন্ত দায়িত্ব হস্তান্তর না করে তিনি টালবাহানা করেন।
সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের আমন থেকে ২০২৫ সালের বোরো সংগ্রহ মৌসুম পর্যন্ত চার মৌসুমে নেত্রকোণা সদর খাদ্য গুদামে ৪০ হাজার টনের বেশি বোরো ও আমন চাল কেনা হয়। ব্যাংক থেকে বিল দেওয়া হয় প্রায় একশ ৯৫ কোটি টাকা। দুর্নীতিবাজ ওসিএলএসডি আবদুল কাইয়ুম বড়জোর ২৫ হাজার টন চাল ক্রয় করেন। বাকি ১৫ হাজার টন চাল না কিনে কাগজ পুঁজি (ভি-ইনভয়েস ও ডিও) করে নয়ছয়ের আশ্রয় নেন। এভাবেই তিনি কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। সূত্র মতে, নিজের বানানো ‘হিস্যা’ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের ১০ কোটি টাকা বিলিয়ে দিয়ে বাকি ৩০ কোটি টাকা নিজের করে নেন ‘ধুরন্ধর’ কাইয়ুম। তার বিরুদ্ধে রিসিভিং পয়েন্টে চাল না পাঠিয়ে ভি-ইনভয়েসের সঙ্গে টাকা পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের চাল রিসিভ করতে ওসিএলএসডিদের চাপ প্রয়োগ করা হয়। দুর্নীতিবাজ আবদুল কাইয়ুম সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ডিও’র চাল কিনেও দেখান সংগ্রহ।
জানা যায়, ‘ধুরন্ধর’ এই ওসিএলএসডি ৪০ কোটি টাকার চাল নয়ছয় করে পার পেলেও ৮০০ টন চাল নয়ছয় করতে গিয়ে ফেঁসে যান। নেত্রকোণার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমানকে ‘ম্যানেজ’ করে খালিয়াজুরী উপজেলার লেপসিয়া খাদ্য গুদামে ৭৯৯ টন ৯৭০ কেজি চাল প্রেরণের ‘গোপন সূচি’ নেন। দীর্ঘ দিনেও চাল না পৌঁছানোয় বিষয়টি জানাজানি হয়। লেপসিয়ার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ওসিএলএসডি এস. এম. শারিকুল ইসলাম চাল না পাওয়ায় ০৬-০৯-২০২৫ তারিখে ৮৬ নম্বর স্মারকে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। শুরু হয় তোলপাড়। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুল আলম ০৮-০৯-২০২৫ তারিখে ১৩.০১.০০০০.৪২২.৫০.০১০.২১.৯৪০ স্মারকে প্রতিবেদন চেয়ে নেত্রকোণার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে চিঠি পাঠান।

সূত্র জানায়, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোয়েতাছেমুর রহমান দুর্নীতিবাজ ওসিএলএসডি আবদুল কাইয়ুমকে রক্ষা করার জন্য দায়সারা প্রতিবেদন দেন। বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে চলে দেনদরবার। সময়ক্ষেপন করার পর নিম্নমানের পুরাতন চাল কিনে লেপসিয়ায় প্রেরণ করা হয়। সূত্র মতে, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের চাপে ওসিএলএসডি নিম্নমানের চাল রিসিভ করতে বাধ্য হন। সরেজমিন তদন্ত হলেই থলের বেড়াল বেরিয়ে আসবে। সূত্র মতে, ২৯-০৭-২০২৫ তারিখে ৪১৩৬৬৩৬, ১২-০৮-২০২৫ তারিখে ৪১৩৬৭৪৫, ১৩-০৮-২০২৫ তারিখে ৪১৩৬৭১১, ১৪-০৮-২০২৫ তারিখে ৪১৩৬৭১২, ১৪-০৮-২০২৫ তারিখে ৪১৩৬৭১৩, ১৪-০৮-২০২৫ তারিখে ৪১৩৬৭১৪, ১৫-০৮-২০২৫ তারিখে ৪১৩৬০০৮ ও ১৫-০৮-২০২৫ তারিখে ৪১৩৬০০৯ ভি-ইনভয়েসের মাধ্যমে ৭৯৯ টন ৯৭০ কেজি চাল প্রেরণ দেখানো হয়। সিরিয়াল না মেনে ভি-ইনভয়েস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করা হয়েছে।
জানা যায়, স্টক অনুযায়ী ২৬-১১-২০২৫ পর্যন্ত নেত্রকোণা সদর খাদ্য গুদামে এক হাজার ৬৬২ টন ৮৭৩ কেজি সেদ্ধ বোরো চাল, ১২৩ টন ২২৫ কেজি গম ও চার লাখ ৫৫৮টি খালি বস্তা মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে গুদামের বিভিন্ন খামালের ভেতরে কৌশলে ৫০০ টনের বেশি নিম্নমানের পুরাতন চাল রাখা আছে। সূত্র মতে, দুর্নীতিবাজ কাইয়ুম ক্রয় নীতিমালা ভঙ্গ করে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাল হয়ে যাওয়া নিম্নমানের চাল কেনেন। লেবারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন খামালে খারাপ চালের বস্তাগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে। খামাল ভেঙে চাল পরীক্ষা এবং সরেজমিন তদন্ত করলেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে। ৫০০ টন চালের সরকারি অর্থনৈতিক মূল্য দুই কোটি ৯০ লাখ টাকার বেশি। সূত্র মতে, গতকাল পর্যন্ত এই গুদামে ২০ হাজার খালি বস্তা কম ছিলো। এর আনুমানিক মূল্য ১৫ লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, মো. আবদুল কাইয়ুম ২০০০ সালে সহকারী উপ খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ২৫-০৩-২০১৪ থেকে ২০-০৫-২০১৬ পর্যন্ত নওগাঁর মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর এলএসডি, ১৭-০৯-২০১৬ থেকে ১২-০৩-২০১৯ পর্যন্ত নওগাঁ সদর এলএসডি ও ০৯-১১-২০২১ থেকে ১০-০৪-২০২৩ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদরের মল্লিকপুর এলএসডির দায়িত্বে ছিলেন। প্রত্যেক কর্মস্থলেই তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতি করে হৈচৈ ফেলে দেন। নওগাঁ থেকে প্রশাসনিক কারণে তাকে সিলেট বিভাগে বদলি করা হয়। সূত্র মতে, অতিমাত্রায় অনিয়ম ও দুর্নীতি করায় এক বছর পাঁচ মাসের মাথায় কাইয়ুমকে মল্লিকপুর থেকে প্রত্যাহার করা হয়। বদলি হন ময়মনসিংহ বিভাগে। খাদ্যমন্ত্রীর বিশেষ তদবিরে চার মাস আগেই এবিএম ফজলে রানাকে সরিয়ে ২২-১১-২০২৩ নেত্রকোণা সদর খাদ্য গুদামের চার্জ নেন।
জানা যায়, দুর্নীতিবাজ এই ওসিএলএসডি গত বোরো সংগ্রহ মৌসুমে মিলারদের সঙ্গে আঁতাত করে ছেঁড়া-ফাটা বস্তায় ওজনে কম নিম্নমানের পুরাতন চাল সরবরাহ নেন। গুদামে থাকা বস্তাগুলোর প্রতিটিতে এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত চাল কম রয়েছে। সূত্র মতে, গত মৌসুমে জুট মিল কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারের কাছ থেকে বস্তা সরবরাহ না নিয়ে ‘ধুরন্ধর’ কাইয়ুম টাকা নেন। মিলারদের কাছ থেকে নিম্নমানের ছেঁড়া-ফাটা ও রিপেয়ার করা বস্তায় চাল সরবরাহ নিয়ে বস্তার টাকা আত্মসাত করেন। পুরাতন ও নিম্নমানের বস্তার গায়ে মিলের নাম ও ঠিকানা এবং সঠিক কোনো স্টেনসিল নেই।
নেত্রকোণা সদর খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডি মো. আবদুল কাইয়ুমের অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে ময়মনসিংহ বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুল আলম বুধবার (২৬-১১-২০২৫) দৈনিক জাগ্রত বাংলাকে বলেন, ওই কর্মকর্তার বিষয়ে আমরা লিখিত এবং মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধ করে থাকলে তিনি ছাড় পাবেন না।
উপদেষ্টা সম্পাদক: দীপক মজুমদার
সম্পাদক: মীর আক্তারুজ্জামান
সর্বস্বত্ব: এমআরএল মিডিয়া লিমিটেড
ঢাকা অফিস: মডার্ণ ম্যানসন (১৫ তলা), ৫৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০
ময়মনসিংহ অফিস: হাসনাইন প্লাজা (দ্বিতীয় তলা), ৭ মদন বাবু রোড, ময়মনসিংহ-২২০০
সেলফোন: ০৯৬১১-৬৪৫২১৫, ০৯৬৯৭-৪৯৭০৯০
ই-মেইল: jagrota2041@gmail.com
ফোন :
ইমেইল :